কালের নায়ক

বিমল

মিজ ঘোষ পাবলিশাস” প্রাঃ লিঃ ১০ হ্টামাচরণ তে উ, কলিকাতা দ্

প্রথম প্রকাশ, চৈত্র ১৩৬৩ ছিতীয় মূদ্রণ

প্রচ্ছদপট অঙ্কন: গৌতম রায় দ্রণ : চয়নিক। প্রেস

মির ঘোষ পাবলিশার্স প্রাঃ লিঃ, ১* শ্ামাচয়ণ দে স্ট্রীট, কলি-৭৩ হইতে এস, এন রায় কর্তৃক প্রকাশিত তাগনী প্রেস, ৩* বিধান মরদী, কলি- হইতে প্রহুর্ধনারায়ণ ভট্টাচার্য কর্তৃক মু,

রেশ মজুমদার গ্রীসম ১০

আমাদের প্রকাশিত

এই লেখকের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বই £ সীমারেখা

সঙ্গিনী

যাছুকর

স্বপ্পের নবীন সে

পরবাস

কালের নায়ক

দেওয়ালে পিঠ দিয়ে সতীন চুপচাপ বসে ছিল |) বসে বসে রাস্ত। দেখছিল। অলস ভাবে বসে থাকলেও তার চোখ দেখে মনে হচ্ছিল, সে যেন কারও অপেক্ষা করছে শরৎ কাফে-র সামনের সি'ড়িতে রোদ এসে গেছে অনেকক্ষণ ; আর একটু পরেই চৌকাট ডিডিয়ে দোকানে ঢুকে পড়বে দোকানের চৌকাটে রোদ এলে এগারোটা বেজে যাবে। সতীনরা এসব জানে , শরৎ কাফে-র দেওয়ালে ঝোলানো ঘড়ির দিকে ন! তাকিয়েও সময়টা বল! যায়, আরও নিভূল ভাবে, সঠিক ভাবে। সামনের রাস্তার দিকে তাকালেও মোটামুটি সময়টা বোঝা যায়। যেমন, এখন রাস্তার দিকে তাকিয়ে সতীন খুব একটা ভিড় দেখছে না। পাড়ার বাবুদের বাজারহাটের হিড়িক, অফিস ছোটার পালা শেষ হয়ে এসেছে একটু পরেই এক পাল কাচ্চাবাচ্চা আর তাদের মা-মাসিদের দেখা যাবে * মানে ছেলেদের স্কুলের প্রাইমারি সেকশানের ছুটির ভিড় সাড়ে দশটায় প্রাইমারির ছুটি হয়। এগারোটায় মেয়ে-স্কুলের ছুটির পর সামনের রাস্ত। নীল ক্কাট আর হালকা নীল শাড়িতে ভরে যাবে। খানিকট! সময় পুরো জায়গাটা কেমন কলকল করে উঠবে। মেয়ের! চলে যাবার পর দিদিমণিরা যখন একে একে যেতে শুরু করবে-_-তখন, ঠিক তখন শরৎ কাফে-র রান্নাঘরের দিক থেকে পি'য়াজ-রম্্ুনের গন্ধ ভেসে আসবে। সতীন এটা লক্ষ করেছে, লক্ষ করে দেখেছে, দিদি- মণিদের যাওয়া আর শরৎ কাফে-র রান্নাঘরে পিয়াজ বাটা! প্রায় একই সঙ্গে ঘটে যায়। ব্যাপারট। মজার। শরৎ কাফে-র চপ-কাঁটলেট বিকেলে তৈরী হবে, অথচ তার যত রকম মশলা বাট! এই এগারো সোয়৷ এগারোতেই শুরু হয়ে যাবে ।.... পকেট থেকে একটা খুচরো চারমিনার বের করল সতীন। বের করে শরৎ কাফে-র নীলুকে ডাকল, দেশলাই দিয়ে যাবার জন্তে। এখন শরৎ কাফে ফীাকা। সামান্ত আগে মথুর-টথুর উঠে গেছে। মথুররা দোকানের বড় বেঞিতে বসে সীতাপতি মুখুজ্যের বাড়িতে আগুন লাগার গল্প করছিল। গতকাল সন্ধ্যের দিকে সীতাপতি মুখুজ্যের বৈঠকখান!

কালের নায়ক

ঘরে আগুন লেগে গিয়েছিল। লেগেছিল ভালই ; ছুটো জানলা পুড়েছে, কাচের শাসি ফেটেছে, আসবাবপত্র ঝলসে গিয়েছে, মায় পুরনো আমলের বাড়ির কড়িকাঠেও আঁচ লেগেছে কি করে আগুনট। লাগল তাই নিয়ে নানা গবেষণ।। ইলেকদ্রিক তার থেকে? নাকি কেউ পেট্রল ছড়িয়ে দিয়েছিল? আগুন লাগার পর পাড়ার নানু, গোপী আর সাহেবকে দেখা যাচ্ছে না। পুলিসের একটা গাড়ি আজ সকালেও একবার পাড়ায় চকর মেরে গেছে

সতীন সিগারেটট। ধরাবার সময় দেখল, কপিল আসছে

কপিল শরৎ কাফে-র সি ড়িতে দাড়িয়ে থাকল। রাস্তার মুচিকে ডেকেছে। মুচি আসার পর পায়ের চটি ছুটো মুচিকে দিয়ে খালি পায়ে সতীনের মুখোমুখি এসে বসল।

“আমি ভাবছিলাম, তুই উঠে পড়েছিস»” কপিল বলল।

সতীন চারমিনার সিগারেটের তামাকের গুড়ো জিবের ডগা থেকে ফেলে দিতে দিতে বলল, “এই তোর দশটা £”

“কি করব মাইরি, দেবু বিশ্বাস দেরি করিয়ে দিল। আমি সাড়ে নট] থেকে গিয়ে বসে আছি লোকের পর লোক দেখাই হয় মা ।"*" চা খাবি?

দ্বল্‌।”

কপিল নীলুকে চা দিতে বলল

“তোর চটির কি হল ?” সতীন অকারণে জিজ্ঞেস করল।

পন্ট্যাপটা ছি'ড়ে গেল। একটা বুড়ো এমন বেকায়দায় পেছন থেকে পা চেপে ধরল**! আজকাল জুতোফুতো যা তৈরী করে মাইরি, একেবারে থার্ড ক্লান। নতুন চটি। পুজোর সময় কিনেছিলুম ।”

সতীন রাস্তার দিকে তাকাল। জ্ঞানেশদার স্কুটার নিয়ে একটা ছোঁকর! মতন মিন্ত্রীকি যেন করছে। পাশে জ্ঞানেশদা।

“দেবু বিশ্বাস কি বলল?” সতীন জিজ্ঞেস করল।

«বলল, ডিসেম্বর নাগাদ কাগজে নোটিশ বেরুবে।”

সতীন মনে মনে হিসেব করল। এখন নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি

কালের নায়ক

“ডিসেম্বরের কখন ?” সামান্ত সন্দেহ গলার ত্বরে।

“তার কোনো ঠিক নেই, শেষের দ্রিকে হতে পারে। আবার জান মআরিতেও |”

সতীন বন্ধুর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকল, যেন বোঝবার চেষ্টা করছিল, কপিল তাকে মিথ্যে স্তোক দিচ্ছে কি না।

নীলু চা দিয়ে গেল।

সতীন বলল, “দেবু বিশ্বাস গুল দিচ্ছে না তো রে?

কপিল সতীনের লম্বাটে কালচে মুখ, সন্দিগ্ধ চোখ দেখতে দেখতে মাথা নাঁড়ল, বলল, না গুল নয়। আমার অন্য সোর্স আছে। দেবুদাদের ব্যাঙ্কে লোক নেবে আমি জানি ।”

সতীন চাঁয়ের কাপ তুলে নিল। “আমার বিশ্বাস হচ্ছে না।”

“তোর কিছুই বিশ্বাস হয় না,” কপিল ক্ষুণ্ন হল।

সতীন চায়ের ঢোক গিলে ফেলল “দেবু বিশ্বাস রুণুকে চাকরি দেবার নাঁম করে কতদিন ঘুরিয়েছে তুই জানিস ?”

কপিল কেমন বিরক্ত হল। বলল, “রুণুর কেস আলাদা রুণু বেটা কিন্তু জানে না তুই একটা! সিম্পল্‌ জিনিস ভেবে দেখ সেরেফ ' টুকে টৃকে রুণু হায়ার সেকেণ্ডারী থেকে বি. কম. পর্যন্ত চালিয়ে গেল, বেট! একটা লাইন লিখতে জানে না, মামুলী যোগ করতে দিলে ভূল করে, বেটার মাথা সলিড, ওকে ব্যান্কে চাকরি দেওয়া যায়? দিলে দেবুদার বান্ধু হয়ে যাবে।”

সতীন কিছু বলল না। রুণু যে আগাগোড়া টুকে পাস করে গেছে তাতে কোনও সন্দেহ নেই সতীনের, কিন্তু সতীন নিজেও একেবারে ধোয়। ভূলসীপাতা৷ নয়। তার মাথা হয়ত রুণুর চেয়ে পরিষ্কার তবে ঠিক ততটা! পরিঞ্ষার নয় যাতে ব্যান্কের চাকরির কোনও পরীক্ষা হলে সে ভাল ভাবে উতরে যেতে পারে নিজের ওপর সতীনের সে বিশ্বাস নেই। অথচ তার দাদারা, দিদি, এমন কি ছোট বোন কাজলও লেখাপড়ায় ভাল। তার বড়দ। এম. এ.-তে ভাল করেছিল। এখন সরকারী চাকুরে। মেজদা আরও ভাল। ..প্লাস করার পর কলেজে

কালের নায়ক,

চাকরি জুটে যায়, অবশ্য মফন্বল কলেজে তারপর কলকাতায় চাকরি পেয়ে এখন কলকাতায়। দিদির বিয়ে না হয়ে গেলে নিশ্চয় স্কুলে মাস্টারি করত। ছোট বোন কাজল এখন কলেজে, ফাস্ট” ইয়ার শেষ করেছে। তারও মাথা আছে। শুধু সতীনেরই মাথ! নেই বা ঘিলু তেমন কাজের নয়

নিজের ঘিলুর মাঁপ করতে গিয়ে সতীন হেসে ফেলল হালকা! হাসি।

কপিল চা খাচ্ছিল। সে শব্দ করে চাখায়। সিগারেট টানার সময়ও মাঝে মাঝে শব্ধ করে।

রাস্তায় বাচ্চাকাচ্চার ভিড়। প্রাইমারি সেকশানের ছুটি হয়ে গেছে বড় ধরনের একট। দল চলেছে হল্লা করতে করতে ছুটে ছেলে কাঠের স্কেল নিয়ে মাথার ওপর নাচাচ্ছে। একজন তার টিনের বাক্সটা সামনের ছেলেটার কাধে তুলে ধরার চেষ্টা করছে বার বার। বাচ্চাদের কারও কারও সঙ্গে মা! কিংবা! পিসি-মাসি | সামান্য পরেই বড় ছেলের আসতে শুরু করবে। বড়দের স্কুল এগারোটায়। বড় ছেলেগুলে! আজকাল লাটের মতন স্কুলে আসে সতীনরা এতটা পারে নি।

কপিল বলল, “তোকে একদিন নিয়ে যাব, সতু |”

“কোথায়? দেবু বিশ্বাসের কাছে ?”

«একদিন চল্‌ ।-**আমার সঙ্গে আলাদা একট ব্যাপার আছে ওদের। সানুদার আমি ফেভারিট সানুদা যদি তার দাদাকে বলে দেয় তোর সেন্ট পার্সেণ্ট চান্স ।”

সতীন কোন উৎসাহ বোধ করল না। কপিল যতটা ভাবে ততটা! নয়; বিশ্বাস-বাড়িতে কপিলের যতটুকু খাতির তাতে কিছুই ভরসা করা যায় না। সানু, মানে দেবুদার ভাই শান্তিব্রত, প্রয়োজনের সময় পাড়ার ছেলেদের খাতির করে। এখন তার খাতির করার দরকার নেই। রজনী মিত্তির ইলেকশাঁনে জেতার পর থেকে সাম্ু বিশ্বাস তার ডান হাত। দাপটে ঘ্বুরে বেড়াচ্ছে। লোকে বলে, সানু রজনী মিত্তিরের পেটো পার্টির ইনচার্জ ; দেবু বিশ্বামই আসল, রজনী মিত্বিরের মাথা ।'

কালের নায়ক

শেষ করে কপিল পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করল।

“হুপুরে কি করছিস কপিল সতীনকে সিগারেট দিল। নিজে নিল।

“কিছু না।”

"সিনেমায় যাবি ?”

“কোথায় %?

“নিউ এম্পায়ার। দারুণ ছবি হচ্ছে একটা ।”

সিগারেট ধরানো হয়ে গিয়েছিল। সতীন ধোয়া গিলে বলল, সদেখেছি।”

কপিল যেন অবাক হয়ে তাকাল “কবে দেখলি ?”

“কাল উমা নিয়ে গিয়েছিল ।”

কপিল তেমন খুশী হল না। সামান্ যেন ব্যঙ্গের গলায় বলল, “তোর তাহলে ভাল দিন যাচ্ছে... উম! তোকে সিনেম। দেখাচ্ছে

সতীন আলম্তের ভঙ্গিতে হাই তুলল। সামনের রাস্তায় একটা হলুদ রডের ট্যাক্সি এসে দাড়িয়েছে জনা তিন-চার লোক পাড়ার কেউ নয়। অচেনা মেয়ে-স্কুলের ছুটি হয়ে গিয়েছে। প্রথম দলটাঁকে রাস্তায় দেখা গেল। আজ সকাল থেকেই উমাপদ বেপাত্তা

মুচি এসে কপিলকে চটিজোড়া দিয়ে গেল। কপিল সেলাই দেখে পয়সা মেটাল। ..

“তা হলে টাইগারে চল্‌,” কপিল বলল, “কি একটা জেমস বগু হচ্ছে” মা

সতীন হঠাৎ চোখের ইশারায় রাস্তার দিকটা দেখাল “ওকে চিনিস ?”

কপিল মুখ ঘুরিয়ে . রাস্তা দেখছিল। পাঁচ-সাতটি বড় বড় মেয়ের একট দল যাচ্ছে “কাকে?”

“ওই যে ফরসা, রোগা মেয়েটাকে ?”

কুপিল দেখল মাথা নাড়ল-__চেনে না।

কালের নায়ক

সতীন বলল, “তুলসীর মামাতো বোন। তুলসীর খবর জানিস ?”

“জেল থেকে পালাবার চেষ্টা করেছিল শুনেছি ।”

“মারা গেছে ।” সতীন ঝা! হাতে মাথার উক্বথুস্ক চুল গোছাতে লাগল। “ছুটো গুলি লেগেছিল। পিঠে।”

কপিল রাস্তায় মেয়েদের ভিড়ের দিকে তাকিয়ে থাকল। তুলসী ঠিক তাদের বন্ধু নয়, এই পাড়াতেও থাকত না। পাড়ায় আসা- যাওয়া করত। হীরুর বন্ধু। হীরুর সঙ্গেই তুলসীকে দেখতে প্তে কপিলরা। মুখ-চেনা ভাব হয়েছিল। তুলসী গত বছর ধরা পড়ে। পুরো এক বছরেরও বেশী জেলে পড়েছিল। তারপর জেল ভেঙে পালাবার চেষ্টা করে। তুলসীর জেল ভেঙে পালাবার খবরটা তারও কানে এসেছে, তবে মারা যাবার খবর সে শোনে নি।

সতীন বলল, “জেলে অনেক ছেলেকে পিটিয়ে মেরে ফেলছে, তুই জানিস ?”

মাথা নাড়ল কপিল। শুনি তো!”

“শালারা হারামজাদা”, সতীনের চোখ-সুখ দ্ৃণায় কুচকে উঠল। “পুলিস বেটারা পয়লা নম্বরের শয়তান এই বেটাদের হাতে গভনমেণ্ট '-*বেধু একটা চাকরি পাচ্ছিল, পুলিসের চাকরি, আমাদের থানার ও. সি. তাঁর চাকরির বারোটা বাজিয়ে দিল। কি লোক মাইরি !”

কপিল উঠে পড়ার জন্যে ব্যস্ত হল। “চল্‌, ওঠ.”

সতীন সিগারেটের টুকরোটা চায়ের কাপের মধ্যে ফেলে দিয়ে উঠে, দাড়াল

শরৎ কাফে থেকে নেমে কপিল বলল, “কি রে, সিনেমায় যাবি £”

সতীন কি যেন ভাবছিল বলল, “তুই যা আজ আমায় বিকেলে এক জায়গায় যেতে হবে ।”

“সন্ধ্যেবেলায় যাস ।”

“ন1 7 দেরি হয়ে যাবে ।”

“কোথায় যাবি ?” .

“বাবার জন্তে একবার মৌলালি যেতে হবে। সেখানে কে বড়

কালের নায়ক

হোমিওপ্যাথ ভাক্তার আছে ।”

«তোর বাবা এখন খেতেটেতে পারছেন ?”

“কই ! খুব কষ্ট হয় খেতে গলায় লাগে একদিন একটু রক্ত উঠেছিল ।”

“গলার দোষ। আমার এক মামারও রক্ত উঠত ।”

“সবাই বলছে ক্যানসার আমাদের অনিল ডাক্তারও সেই রকম বলেছে বাবার এক বন্ধু হোমিওপ্যাথির কথা বলছিল। বড়দ! মৌলালিতে কোন্‌ ডাক্তার ঠিক করেছে আমি বাবাকে নিয়ে যাব, বড়দ1 অফিস থেকে আসবে ।” |

কপিল যেন কথাটা তেমন আমল দিল না। বলল, “কিসের ক্যানসার ! আজকাল ডাক্তাররা সব ব্যাপারেই ক্যানসার বলে। আমার তোর সকলের ক্যানসার তোর অনিল ডাক্তারকে ছাড় শাল! ছুলুর দিদিকে ইন্জেকশান দিতে গিয়ে মেরে ফেলেছিল, মনে নেই !”

সতীন নিজে অন্থখ-বিস্থখের ব্যাপার কিছু বোঝে না। তার বাবার গলা ব্যথা, খাবার কষ্ট, এমন কি শ্বাসকষ্ট যে কি ধরনের ব্যাধি সে জানে না। বাবা আজ মাস চারেক হল এই সব উপসর্গ নিয়ে তূগছে। বড়দ। বাবার ব্যাপারে বরাবরই সাবধানী ডাক্তারটাক্তার দেখাবার কোন অযত্ব করে নি। গলার ডাক্তারও দেখিয়েছে কিন্তু এখন এমন কোনো খারাপ সন্দেহ বড়দারও হয়েছে যাতে আলোপাথির ব্যাপারট৷ বড়দা এড়িয়ে যেতে চাইছে মেজদা এবং দিদির সঙ্গে বড়দার যে- ধরনের কথাবার্তা হয় তাতে সতীন বুঝতে পারে, বাবাকে কোনো রকমে যতদিন পার! যায় বাঁচিয়ে রাখা ছাড়া অন্য কোন ঝুকি কেউ নিতে রাজী নয়।

সতীন অন্যমনস্ক ভাবে মোহনের স্টেশনারী দোকানের সামনে দাড়িয়ে পড়ল। ীড়িয়ে পড়ে কপিলের দিকে তাকাল

“তুই মোজা 'বাড়ি যাবি তো %

“হ্যা ।”

“তা হলে তুই যা। সন্ধ্যেবেলায় দেখা হতে পারে ।”

কালের নায়ক

“কোথায় থাকবি ?”

“শরৎ কাফেতে |”

“দেখি, আসতে পারি ।”

কপিল চলে গেল। সতীন ছু পলক তাকিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিতেই চোখে পড়ল, রাস্তার মরা বকুলগাছের তলায় স্কুলের জনা তিনেক দিদিমণি। পেছনে রিকশায় আরও ছুজন। স্কুলের ছু-চারজন দিদিমণি সতীনের বেশ চেনা একজন তো! আর একটু হলেই তার মেজবউদি হয়ে যেত। দিদির অমত থাকায় প্রণতিদির সঙ্গে মেজদার বিয়েটা! হয় নি। মা মারা যাবার পর থেকে বিয়েখার ব্যাপারে দিদি এবাড়িতে মা'র জায়গা নিয়ে নিয়েছে দিদির কথা বাবা খুব মানে বড়দাও | মেজদার বোধ হয় নিজের কোন পছন্দ-অপছন্দ ছিল না। কাজেই বিয়েট। হল না বলে এখন বিয়ের কথা চাপা পড়ে গেছে বাবা একটু ভাল থাকলে এই শীতের শেষে মেজদার বিয়ে হয়ে যেতে পারে। দিদি অন্ত পাত্রী দেখে রেখেছে

সতীন মোহন স্টেশনারীর সামনে ছাড়িয়ে একটা ব্লেড রা |

“ক পয়সা! রে?”

“উনিশ |”

“ইয়াফি পেয়েছিস ! সেদিন পনেরো নিলি 1”

“দাম বেড়ে গেছে।”

“তোদের দোকানে রোজই দাম বাড়ে ।**.তোদের শালা কেন মিলায় ধরে না মাইরি !”

“ধরিয়ে দাও না মাইরি, আমরাও বেঁচে যাই ব্যবসা করতে বসে সকালু থেকে রাত পর্যন্ত তোমাদের খিস্তি শুনি ।”

সতীন পয়সা দিল। “নে শালা, নিয়ে নে। সবাই নিচ্ছে, তুই আর বাদ যাবি কেন ?”

দোকানের মালিক শঙ্কর সতীনেরই সমবয়সী | পয়সা নিয়ে বলল, “কালকের আগুনের ব্যাপারট। শুনেছ ?”

«আবার কি হল?

কালের নায়ক

“তুমি কোনও খবর রাখ না ?”

“রাখি আগুন লাগার ব্যাপারটা সন্দেহ করছে ।*

“আজ সকালে কেস পালটে গেছে ।”

“মানে ?” সতীন অবাক চোখে তাকাল।

“বড় বড় বাড়িতে কারবার অন্যরকম হয়, সতু” দোকানের শঙ্কর বলল, “আজ সকালে শোনা যাচ্ছে সীতাপতির ছোট ছেলের বউ কাল বৈঠকখান! ঘরে ঢুকে সুইসাইড করবার চেষ্টা করেছিল ।”

“স্থইসাইভ.?” সতীন যেন চমকে গেল

শঙ্কর নাকের নস্তি মুছতে মুছতে চোখ টিপে হাসল। “কেরাসিন তেলের টিন নিয়ে মরতে গিয়েছিল, বুঝেছে? কাপড়ে ঢেলেছিল, ঘরে ছড়িয়েছিল, ভেবেছিল একবার দাউ দাউ আগুন ধরে গেলে দিব্যি মরে যাবে আসলে দেশলাই জ্বালাবার পরই বিবির ভয় ধরে যায় কাঠিট। ছু'ড়ে ফেলে দিতেই ফায়ার বিবি ভয়ের চোটে ঘর ছেড়ে পালায়। মর অত সম্ত। |”

সতীন বিশ্বাম করতে পারল না। সব গুজব। সীতাপতি মুখুজ্যের ছোট ছেলের বউ দেখতে সুন্দরী, বড়লোকের মেয়ে, শ্বশুর- বাড়িও যথেষ্ট বনেদী | সীতাপতির ছোট ছেলে ব্যবসা করে, চা-বাগানের যন্ত্রপাতি বেচার ব্যবসা, মোটর বাইক হাঁকিয়ে ঘোরাফেরা করে, বিশাল চেহারা, মালফাল খায়, অন্য উপসর্গও আছে, কিন্তু মুখুজ্যেবাড়ির ছেলে বা ছেলের বউদের কারও এমন কিছু স্রনাম নেই যে, সাধারণ ব্যাপারে বা তুচ্ছ কারণে কেউ আত্মহত্যা করতে যাবে।

সতীন যেন বিরক্ত হয়েই বলল, «তোরা এসব খবর কোঁথ থেকে পাস্‌?

শঙ্কর বলল, “ঘোড়ার মুখ থেকে ভাই,” বলে একটু হাসল, “ফ্রম হর্সেস মাউথ. 1!”

সতীন কোনো উৎসাহ বোধ করল না। কোনো সন্দেহ নেই, এসব খবর হয় বাড়ির চাকরবাকরের মুখ থেকে শোনা, না হয় কারও তৈরী করা। সীতাপতিদের বাড়ি নিয়ে এমন গুজব প্রায়ই এ-পাড়ায়

১০ কালের নায়ক

শোনা যায়। কেচ্ছার খবর ছড়িয়ে পড়তেও দেরি হয় না সতীন অন্তত ও-বাড়ির একজনকে জানে যার সম্পর্কে তার কোনো খারাপ ধারণ। নেই। সীতাপতির ভাগ্নে প্রেমকিশৌর। প্রেমকিশোর সতীনের বন্ধু ডাক্তারী পরীক্ষা দিয়েছে এবার। চমৎকার ছেলে একেবারে সাদাসিধে নরম চেহারা, কথাবার্তাও খুব সুন্দর কিশোরের বাব! নেই। মা বছর কয়েক হল মারা গেছে। মামার বাড়িতেই মানুষ কিশোর তার মুখে মামার বাড়ির ব্যাপারে কোনোদিন কিছু শোনে নি সতীন। |

সোজা হেঁটে এসে সতীন বা দিকে মোড় নেবার সময় হঠাৎ পেছন ফিরে তাকাল। তাকিয়ে দাড়িয়ে পড়ল

গোপা গোপা স্কুল থেকে বাড়ি ফিরছে।

চোখাচোখি হল গোপা যেন চোঁখের তলায় পাতল! করে হাসল ! হেসে মুখ নামিয়ে সোজা হাটতে লাগল।

সতীন কয়েক পলক দেখল গোপাকে। গোপা এখন মেয়ে-স্কুলে চাকরি করে। নীচু ক্লাসে পড়ায়। থি_.-ফোর ক্লাসে বোধ হয়। তা পড়াক। তবু চাকরি করে। অনেক হাতে-পায়ে ধরে পাড়ার স্কুলে চাকরিটা পেয়েছে গোপা সতীন তো কিছুই পেল না। আজ দেড় বছর একেবারে ঝাড়া বেকার | মধ্যে দিন দশেক এক জায়গায় চাকরি করতে গিয়েছিল, এগারো দিনের মাথায় তাকে বলে দেওয়া হল, পুরনে। লোক ফিরে এসেছে, কাজেই এবারকার মতন আর হল না।

গোপা লগ্নী পেরিয়ে চলে যাচ্ছে দেখে সতীনের একবার ইচ্ছে হল-_-তাকে ডাকে অনেক দিন কোন খোঁজখবর নেওয়৷ হচ্ছে ন। গোপাদের বাড়ির। মাসিমা কেমন আছেন? মেসোমশাইয়ের সেই মামলার কতদূর কি হল?

সতীন দেখল, গোপা! লগ্নী পেরিয়ে ডান দিকে গলির মধ্যে ঢুকে গেল।

সামান্য দাড়িয়ে সতীন বাড়ির দিকে হাটতে লাগল

কালের নায়ক ১১.

বাড়ি ফিরে সতীন শুনল, বাবার সামান্ত জ্বর এসেছে গলার কষ্ট এত বেড়ে গিয়েছিল যে কিছুক্ষণ মুখ হা করে হাপানী রোগীর মতন শ্বাস টানতে হয়েছে।

বড়দা অফিসে, মেজদা কলেজে বাড়িতে বউদি আর কাজল বুলু আর মণি স্কুলে। বুলু পাড়ার স্কুলে পড়ে না। বড়দা! ছেলের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে খুব সাবধানী পাড়ার গোয়ালমার্কা স্কুল সম্পর্কে বড়দার ধারণ! খুব খারাপ, বড়দার ধারণা পাড়ার বেওয়ারিশ কুকুর আর পাড়ার স্কুল একই রকম। এদের কোন জাত নেই, ইজ্জত নেই। ক্ডদার ছেলেমেয়ে বুলু আর মণি জাত স্কুলে পড়ে- ইংলিশ মিডিয়মে। নটা নাগাদ দুজনেই স্কুলে চলে যায়। পাড়ার স্কুলে পড়লে সতীন বাবার খবরটা পেয়ে যেত। কেননা শরৎ কাঁফে-র সামনে দিয়েই বুলুকে স্কুলে যেতে হত

গায়ের জামা খুলতে খুলতে সতীন ছোট বোনকে জিজ্ঞেস করল, “এখন কেমন আছে রে?”

“এখন একটু ভাল” কাজল বলল।

“কিছু খেয়েছে ??

“বউদি সাবুর পায়ে করে দিয়েছে-*-৮

“ভাত আর খেতে পারল না ?”

কাজল মাথা নাড়ল। ন্নানে যাবার আগে কাজল চুল পরিক্ষার করে নিচ্ছিল। আজ তার কলেজ যাওয়া হয় নি। যাবার ইচ্ছেও ছিল না। বাড়িতেই পড়াশোনা করবে ভেবেছিল

সতীন জানলার দিকে রোদের কাছে সরে গেল। দাড়ি কামাতে বসবে

“আজ আবার হঠাৎ বাবার এরকম হল কেন বল্‌ তো?” সতীন অনেকটা আপনমনে জিজ্ঞেস করল

কাজল কিছু বলতে পারল নাঁ। চিরুনি পরিষ্কার করতে করতে দাদার দিকে তাকাল

“নার্ভাসনেস**-৮ সতীন বলল, “আমার মনে হয়, বাবা নার্ভাদ

১২ কালের নায়ক

হয়ে গেছে বিকেলে ডাক্তারের কাছে যেতে হবে ভেবে নার্ভাস হয়ে পড়ছে ।”

কাজল বলল, “বিকেলের এখন অনেক দেরি।৮

সতীন কথাটা শুনল না বোধ হয়। বাবার সব সময় রকম বাড়াবাড়ি হয় না। মাঝে মাঝে হয়। এক-একদিন বেশ ভালই থাকে, নরম ভাত, পানসে তরিতরকারি সবই খেতে পারে, রাত্রে স্থজির পায়েস, রুটি-ছুধ, ছু-একটা। মিষ্টিও। সেদিন হঠাৎ গরম সিডাড়াও খেয়ে ফেলেছিল একটা ছুশ্চিন্তা, দুর্ভাবনা কিংব! ভয় পেলে বাবার গলার কষ্ট আচম্ক1 বেড়ে যায়। তখন গল! দিয়ে শবঁও যেন বেরুতে চায় না।

“এই, একটু জল এনে দে, দাঁড়িটা কামিয়ে ফেলি,” সতীন বলল

কাজল ভাঙা কাপে করে জল এনে দিল

সতীন দাড়ি কামাবার সরঞ্জাম বের করে রোদের দিকে মুখ করে দাড়ি কামাতে বসল।

গালে সাবান মাখতে মাখতে সতীন যেন কৌতুহলবশে নিজের মুখটা দেখছিল তার মুখ বড়দা বা মেজদার মতন নয়। দিদির আর বড়দার মুখের ধাচ একরকম গোল মতন। ছুজনেই বেশ ফরসা মা'র গায়ের রঙ ফরসা ছিল, মুখ গোলগাল ছিল মায়ের মুখ পেয়েছে প্রথম ছুই ছেলেমেয়ে মেজদার রঙ মাঝারি চোখমুখ যেমন ঝকঝকে তেমনি কাটাকাটা৷। মাথাতেও বেশ লম্বা মেজদা মেজদাকে দেখলেই বুদ্ধিমান মনে হয়, বেশ বোঝা যায় কলেজেটলেজে পড়াবার জন্যেই যেন মাস্টার-মাস্টার মুখ হয়েছে। মেজদার মাথার চুল পাতলা, চুল নিয়ে বেচারীর একটু খুঁৎখুঁতেপনা আছে। নয়ত মেজদা কোন ঝক্ধি- ঝামেলায় থাকে না। নিজের ঘর, বইপত্র ঘটা, বউদির সঙ্গে মাঝে মাঝে ঠাট্টা-তামাঁশা--এর বেশী কিছু ন7া। কলেজে আর বাইরে মেজদার কিছু বন্ধুবান্ধব আছে। বাড়িতে ভাল না লাগলে মেজদা সেখানে চলে যায়।

কালের নায়ক ১৩

জুলফির দিকে সেফটি রেজার ছোয়াবার আগে সতীন আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজের চোখ নাক থুতনি আর একবার নজর করল বড়দা-মেজদার সঙ্গে তার মুখের মিল প্রায় নেই। দিদির সঙ্গেও নয়। সে ফরসা নয়। তাকে শ্ামলাও বলা চলে না, বরং কালোর দিকে তার গায়ের রঙ। মুখের আদল লম্বা থুতনি চাঁপা গালের হাড় উচু। নাক মাঝারি। চোখ বড় বড়, কিন্তু মণি সামান্য নীলচে বাবার সঙ্গে মিল আছে হয়তো কাজল আর সতীনের চেহারায় খানিকট। সাদৃণ্ঠ রয়েছে তবে কাঁজল সতীনের মতন অতটা কাঁলচে নয়। তা ছাড়। কাজলের চোখ সত্যিই সুন্দর |

সতীনের একবার মেশানো বসন্ত হয়েছিল। ফলে গালে কপালে গলায় ছু-একট। দাগ থেকে গেছে। চোখের সাদা জমি সামান্য ঘোলাটে নিজের চোখের দিকে তাকালে সতীনের কেমন মনে হয়, মে বোকা। তার বুদ্ধিটুদ্ধিকম। রকম কেন হয়_-সে জানে না।

জুলফির তলা থেকে সতীন সেফটি রেজার টানল। বেশ জোরেই

অন্যমনস্ক থাকার দরুন হোক বা নতুন ব্লেডের জন্যেই হোক, হাতের টান ঠিক মতন না পড়ার জন্যেও হতে পারে-_গাল কেটে গেল।

সতীন দেখল, জুলফির তল! দিয়ে রক্ত পড়ছে চামড়ার তলা দিয়ে ক্রমশই রক্ত চু ইয়ে এসে গালের দিকে গড়িয়ে পড়ছিল

হাতের কাছে কিছু না থাকায় সতীন গায়ের গেঞ্জি খুলে ফেলে গালট! চেপে ধরল।

ছুই এন্টালী বাজারের সামনে দাড়িয়ে একটা ট্যাক্সি খু'জতে খু'জতে হয়রান হয়ে যাচ্ছিল সতীন। এই দন্ধেযর মুখে ট্যাক্সি ধর! খুবই কঠিন কাজ,

'১৪ কালের নায়ক

তবু জায়গাটা যখন ডালহাউমি পাড়া নয়, চৌরঙ্গিও নয়, তখন পনেরো-কুড়ি মিনিট দাঁড়িয়ে একটা ট্যাক্সি পাওয়া যাবে না কেন-__ সতীন বুঝতে পারছিল না। চারদিকে চোখ রেখে সে সব রকম গাড়ি দেখছিল; মাঝে মাঝে ভুল করে হাত তুলে ফেলছিল, এই ট্যাক্সি বলে টেঁচিয়েও উঠছিল, তারপরই দেখছিল তার হাত তোলা এবং 'ডাককে পুরোপুরি উপেক্ষা করে সওয়ারী-সমেত ট্যাক্সিগুলো যে যার নিজের রাস্তায় চলে যাচ্ছে। গলির মধ্যে যে কটা ট্যাক্সি টুকল-__ কোনটাই আর ফাঁক বেরুলো না; হয়ত অন্ত রাস্তা দিয়ে চলেও গেল কেউ কেউ।

সতীন একট] চারমিনার ধরিয়ে নিল। আপাতত ট্যাক্সি পাওয়া যাবে বলে তার মনে হচ্ছে না। আরও কিছুক্ষণ হা করে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। অনেকক্ষণ সে সিগারেট খেতে পায় নি। বাবাকে সঙ্গে করে বাড়ি থেকে বেরুনোর পর থেকেই সে সুযোগ হল নাঁ। ডাক্তারবাবুর চেম্বারে বাবাকে বসিয়ে রেখে বাইরে, এসে ছুটে! টান মেরে যাবে তাঁও সম্ভব হয় নি; প্রথমত বাবার জন্যে, দ্বিতীয়ত বড়দার জন্যে বাবা বাড়ি থেকে বেরুবার সময় এমন ফ্যাকাশে, হতাশ, অসাড় মুখ করে বেরুলো৷ যে মনে হল, বাবা যেন বুঝেই নিয়েছে _ যেখানেই বাবাকে নিয়ে যাওয়া হোক _ ভরসার আর কিছু নেই, কিছুই নয়। ওরকম ঘাবড়ে যাওয়া সাদাটে মুখ দেখলে নিজেকেও কেমন ঘাবড়ে যেতে হয়। বউদি আবার বলে দিল, "খুব সাবধানে নিয়ে যাবে, এক] রেখে উঠবে না ।” তার ফলে ডাক্তারখানাতে এসেও সতীন বাবাকে নিয়ে বসে থাকল ব্ড়দা এল কাটায় কাটায় সোয়া গাচটায়। ভাক্তারের ঘরে ঢুকতেই আরও আধঘন্টা কেটে গেল। এই আধঘণ্টা বড়দা কেবল উদখুস করেছে, অধৈর্য হয়ে ডাক্তারের লোককে বার বার বলেছে, “আমার আগে থেকেই আযাপয়েপ্টমেন্ট করা আছে; আপনি ওঁকে বলবেন আমি ইনকাম ট্যাক্সের কমল মল্লিকের কাছ থেকে আসছি। পেসেন্ট বুড়ো লোক, তার পক্ষে বেশীক্ষণ বসে থাকতে কষ্ট হচ্ছে খুব

কালের নায়ক ১৫

হোমিওপ্যাথি ডাক্তারের যে এত পশার হয় সতীন জানত না। পাড়ার কেষ্টবাবুকে সে দেখেছে, লোকে বলে, “হোমো-কে্ট, শীখার দোকানের পাশে দেড়হাতি ঘরে সকাল-সন্ধ্যে নড়বড়ে টেবিল চেয়ার নিয়ে বসে থাকে, কদাচিৎ তার কাছে একসঙ্গে তিন-চারজন লোককে দেখা যায়। মন্মথ ভাহুড়িও হোমিওপ্যাথ ; বাড়িতেই তার চেম্বার ; সেখানেও লোকজনের এমন একটা আসা-যাওয়া নেই ; মন্মথ ভাছুড়ি তার ছোট শালাকে দিয়ে চেম্বারের পাশে একটা দরজির দোকান দিয়েছে।

এখানে কিন্তু ব্যাপারস্তাপার একেবারে আলাদা রুগী বসার ঘরটাই কত বড়! পর পর চেয়ার। অন্তত পনেরো ষোলোটা। ডাইনে-কায়ে আড় করে রাখা একদিকে একটা টেবিল। দেওয়ালে বড় বড় ছবি, একটা আয়না) হ্যানিমানের মস্ত ছবির পাশে দক্ষিণেশ্বরের কালী, কালীর ছবির চারপাশে জবার শুকনো মাল ঝুলছে।

সতীন থাকতে থাকতেই ঘর প্রায় ভরে গেল, রাস্তায় গাড়ি এসে দাড়াল গোটা চারেক জন মহিলা! এলেন, ধাদের বয়েস পঞ্চাশ- টঞ্চাশ হবে। গায়ের রঙ, সাজগোজ দেখে মনে হল বড় বাড়ির মানুষ, প্রায় হাতভর! চুড়ি, মাথায় কাপড়, সঙ্গে বাড়ির সরকার গোছের একটা লোক, সে বাইরে দরজার কাছে দাড়িয়ে থাকল। এই ধরনের ধুমলীদের যে কী অসুখ করে কে জানে! চবিটবির হতে পারে। এক ভদ্রলোক একটি মেয়েকে সঙ্গে করে এনেছেন, মেয়েটির সমস্ত শরীর যেন রক্তশৃন্ত, নাক লম্বা, চোখ গর্তে ঢুকে গেছে, চেয়ারে বসে মেয়েটি সেই যে মুখ নীচু করল, আর তুলল না। পাঁগলটাগল হতে পারে।

দেখেশুনে তো মনে হয়, এই ডাক্তার ফেলনা নয়। সতীন বাড়িতে ুনেছিল, চেম্বারে বত্রিশ টাকা ভিজিট বাড়িতে পুরোপুরি চৌধনটি নেন না, পঞ্চাশ নেন, কেননা! হোমিওপ্যাথির প্রচার ভার লক্ষ্য চেম্বারেও ধরা-করা করলে ষোলো-কুড়ি হয়। বড়দা ষোলোয় ব্যবস্থ। করেছে। ইনকাম ট্যাক্সের লোকের মারফতে

ব্যাপারট। সতীনের ভাল লাগে নি। বড়দ্বার মতন্ন মানুষের পক্ষে

১৬ কালের নায়ক

ষোলো টাকা বাঁচানোর জন্তে ধরা-করার কোন মানে হয় না। বড়দার মেয়ে-মানে মণির জন্যে সেদিন এক মাস্টার ঠিক হল-_যে হণ্তায় তিনদিন আসবে, দক্ষিণা একশো! পঁচিশ দেড়শো চেয়েছিল আগে মাসে মাসে একশে। পঁচিশ যে লোক মেয়ের মাস্টারের জন্যে দিতে পারে সে লোক কেন ষোলো! টাক বাঁচাবার জন্যে এত ছোট হবে 1.-- না না, সতীন বড়দাকে দোষ দিচ্ছে না বা বলতে চাইছে নাঁ_বাবার ব্যাপারে বড়দা গাফিলতি দেখাচ্ছে বড়দা মোটেই তা দেখায় নি, বাবার জন্তে বড়দার চিন্তা-দুশ্চিন্তার শেষ নেই, অবহেলার কথাই ওঠে না; তবু ব্যাপারট! খারাপ লাগে চোখে মনে হয়, নিজের ছেলেমেয়ে এবং নিজের বাবার মধ্যে একট পার্থক্য রয়েছে সতীন কোনদিন এসব জিনিস খু'টিয়ে দেখতে বা ভাবতে চায় না, তার অত মাথা নেই, আগ্রহ নেই। কিন্তু যদি এসব কিছু তার হঠাৎ-হঠাৎ খেয়ালে এসে যায়--তাহলে অবাক না হয়ে পারে না। বাবা বুড়ে। মানুষ, তার দিন শেষ হয়ে যাচ্ছে, যতই বাবার দিন শেষ হয়ে আসছে ততই বডদ! বাবার সঙ্গে সম্পর্ক আলগা করে ফেলছে, যেটুকু কর্তব্য, যা করা উচিত, না করলে বিবেকে লাগবে, দৃষ্টিকটু দেখাবে বা মনে হবে বাবার ওপর ব্ড়দার কোন কৃতজ্ঞতা নেই-_বড়দা কি সেইট্কুই মাত্র করতে চায়! যে যাবার জন্যে পা বাড়িয়েছে তার জন্যে খরচ বাঁচানোর মতনই না ব্যাপারটা! সতীন বুঝতে পারে না। বোধ হয় মানুষের এই রকমই হয়__বাবাটাবা দুরের হয়ে যায় একসময়ে, ছেলেমেয়েই হয় কাছের।

ণট্যাজসি- ট্যাক্সি-_এই ট্যাক্সি-** সতীন একট। ফাকা ট্যাকি দেখতে পেয়ে হাত তুলে ছুটল।

ট্যাক্সিটা দাড়াচ্ছিল না; হয়ত দাঁড়াত না; কিন্ত গলির দিক থেকে একটা ভ্যান বেরিয়ে আসায় রাস্তা না পেয়ে দাড়িয়ে পড়ল।

সতীন ছুটে গিয়ে ট্যাক্সি! ধরে ফেলল

“আমহার্ট স্্বীট যাব, রুগী আছে-__”, সতীন বলল মুখ বাড়িয়ে।

ট্যান্সিঅলার পাশে একটি ছেলে কেউ কোন জবাব দিল না

কালের নায়ক ২১৭)

সতীন ব্যাপারটা বুঝতে পারল না। ট্যাক্সি যাবে কি যাবে না? কাজে কাজেই মে একটু কায়দা করল। পেছন দিকের দরজায় হাত রেখে যেন ট্যাক্সিঅলার সম্মতি পেয়ে গেছে, মোলায়েম গলায় বলল, “ওই যে, গলির বা দিকে--ওই ডাক্তারখানায় রুগী রয়েছে। বুড়ো লোক ।”

ট্যাক্সিঅলা তখনও চুপচাপ। সতীনের দিকে নজরও করল না

হয়ত ট্যাক্সিটা চলেই যেত, হঠাৎ ড্রাইভারের পাশের ছেলেটি নীচু গলায় কি যেন বলল ড্রাইভারকে--তারপর মাথা ঘুরিয়ে পেছনের দরজা খুলে দিল।

সতীন ট্যাক্সির মধ্যে উঠে বসল

সামান্য এগিয়েই বড়সড় গলি, গলির মুখে বাঁ হাতে ডাক্তারখান!

ট্যাক্সিট! দাড় করিয়ে সতীন নামতে যাচ্ছে, হঠাৎ সামনের দিকের ছেলেটি বলল, “আপনার নাম সতীন দত্ত না ?”

সতীন অবাক! কেমন যেন থতমত খেয়ে সামনের ছেলেটিকে দেখবার চেষ্টা করল। ছেলেটির ঘাড় সামান্য ঘোরানো, স্পষ্ট করে মুখ দেখা যাচ্ছে না; ঘন লম্বা জুলফি, মাথার চুল ঘাড় পধস্ত, থুতনি গাল তেমন পরিক্ষার নয়, পাতল। দ্রাড়িতে ময়লা হয়ে রয়েছে

সতীন কিছু বলার আগেই ছেলেটি আবার বলল, “সিটি কমান+--১”

ঘাবড়ে গিয়ে সতীন বলল, “আপনি ?”

“জগন্ময়। জগন্ময় সিংহ |”

সতীন যেন এক মুহুর্ত সময় নিল নামটাকে মনে করতে, তারপর খুশীর গলায় বলল, "আ-রে, জগন্ময় !”

জগন্সয় হাসল কিনা বোঝা গেল না, সতীন হাত বাড়িয়ে জগন্ময়ের কাধে হাত রাখল “ভাবাই যায় না-*"! আশ্চর্য ব্যাপার 1”

জগম্ময় বলল, “আমি দেখেই চিনেছি 1”

সতীন বলল, “তুমি মুখ পালটে ফেলেছ, কেউ চিনতে পারবে না” বলে হাসল সতীন।

হু

১৮ ক্খলের নায়ক

জগন্ময়ও হাসল হালকা করে। “রুগী কে?”

“বাবা

“কি হয়েছে ?”

“কি জানি। ডাক্তাররা তো বলছে গলায় ক্যানসার ।”

“ক্যানসার !”

সতীনের হঠাৎ খেয়াল হল তার দেরি হয়ে যাচ্ছে দ্রজ। খুলে নামতে নামতে বলল, “বাবা আর বড়দা অনেকক্ষণ বসে রয়েছে। একটাও ট্যাক্সি পাচ্ছিলাম না ভাই তুমি দয়া করলে তাই--।৮

“আরে দয়া কি ।-""যাঁও নিয়ে এস |”

সতীন নেমে গেল

জগন্ময় আর ট্যাক্সিঅল। কথ বলতে লাগল সাধারণ ভাবে

বেশী সময় লাগল না। সতীন বাবাকে নিয়ে ট্যাক্সির কাছে এসে দ্ঁড়াল। পাঁশে তার বড়দা। জগম্ময় ওদের দেখতে পেয়েই দরজা খুলে দিয়েছিল

সতীনের বাবা বিনয়ভূষণকে অত্যন্ত ছুবল, অবসন্ন দেখাচ্ছিল। ছেলেরা ধরে-করে তাঁকে ট্যাক্সির মধ্যে তুলে দেবার পর বিছানায় গড়িয়ে পড়ার মতন একপাশে তিনি যেন শুয়ে পড়লেন। সতীনের বড়দ। রঘীন উঠল, উঠে বাবাকে আরও আরাম করে বসতে বলল

জগম্ময় সতীনকে সামনে আসতে বলল।

গাড়ি ছাড়ার আগেই বিনয়ভূষণ যেন হাপাতে হাপাতে বললেন, “বিকেল থেকে সন্ধ্যে পর্বস্ত বসে থাকার ক্ষমতা কি আমার আর আছে র্গী!”

এট। অভিযোগ না নিজের অক্ষমতার জন্যে অনুতাপ-_বিনয়ভূষণের গলার স্বর বলার ভঙ্গি থেকে বোঝ! গেল না। তার গলার স্বর ভাঙা-ভাঙা, খসখসে শোনাল। শ্বাসকষ্টও যেন রয়েছে।

রথীন বলল, “একট৷ দিন মাসখানেক পরে আবার আসতে হবে এর মধ্যে হপ্তায় হপ্তায় খবর দিতে বলেছেন।” বলে একটু থেমে আবার বলল, “উনি তো বললেন, দিন পনেরোর মধ্যেই উন্নতি হবার

কালের নাস্কুর ১৪৯.

আশা করছেন। খাওয়ার কষ্টটা মাসখানেকের মধ্যেই চলে যাবার কথা |” | বিনয়ভূষণ কেমন ছেলেমানুষের মতন বললেন, “খুবই বড় ডাক্তার, কি বলো ! কত পেশেন্ট 1” তার কথা থেকে মনে হয়, জীবনের কোন ক্ষীণ আশ্বাস যেন পাবার চেষ্টা করছেন ঘর্ভরা রোগী আর নামকরা ডাক্তার দেখে লে

ট্যাক্সি ততক্ষণে মৌলালির মোড়ে এসে আটকেছে, শিয়ালদ! দিয়ে সোজ। যাবে, গিয়ে রাজাবাজার দিয়ে বা দিকে মোড় নেবে

জগন্ময় শীচু গলায় সতীনকে বলল, “কি করছ তুমি? চাকরি ?”

সতীন মাথা নাড়ল। “না বেকার বসে আছি।” এমন মৃু জড়ানো গলায় কথা বলল সতীন যেন তার গলার স্বর বাবা-দাদার কানে না বায়। অবশ্ঠ মৌলালির মাথায় যে ধরনের ভিড- ট্রাম, বাস, ট্যাক্সি, প্রাইভেট গাড়ি, লরি, রিকশা, ঠেলা, মানুষজনের হট্টগোল তাতে উচু গলায় কথা বললেও পেছনের সিটে বাবা-দাদার কানে যাবার কথা নয়।

ট্যাক্সি আবার চলতে শুরু করল।

সতীন জগন্ময়কে শুধলো, “তুমি কি করছ ?”

“চালাচ্ছি ।” জগন্ময় খাপছাড়া ভাবে বলল

“এই ট্যাক্সি তোমার £”

«আমার? মাথা খারাপ তোমার! ট্যারক্সির মালিক আমি কোথা থেকে হব ??

“তাহলে-_?” সতীন এমন চোখ করে তাকাল যেন সে বুঝতে পারছে ন| জগম্ময় ট্যাক্সির মধ্যে কেন বসে আছে তবে? তার কৌতুহল হচ্ছিল। অনেকটা ঠাট্টার মতন করেই আবার বলল, “আমি ভেবেছিলাম তোমার ট্যাক্সি। মালিক বা মালিকের ছেলেটেলেরা অনেক সময় দেখেছি ড্রাইভারের পাশে বসে থাকে তাই না

জগন্ময় হাসল। “আমি মালিকের ছেলে নয়।”

কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ। সন্ধ্যের ভিড়ে পড়ে ট্যাক্সিটা প্রাচী সিনেমার

কালের নায়ক

কাছ থেকে আর এগুতেই পারছে না, গাঁড়ির পর গাড়ি, বউবাজার- শিয়ালদায় প্রচণ্ড ভিড়, চারপাশ থিকথিক করছে গাড়ি ঘোড়! মানুষজনে। শীতের গোড়ায় ধুলো আর ময়লা উড়ছে অনবরত। চারদিকে এমন একটা হল্লার ভাব, মনে হচ্ছে কয়েক হাঁজার মানুষ এখানে দিশেহারা হয়ে দৌড়োদৌড়ি করছে।

জগন্ময় বলল, “পুরনোদের খবরটবর জান ?”

“পুরনো মানে আমাদের নাইট্‌ ব্যাচের কথা বলছ ?”

“সেই সলিল কি করছে ?”

“সলিল খুব লাকি; ওকে বসে থাকতে হয় নি; রেলে চাকরি পেয়ে গেছে৷”

“আর তপন ?”

“তপন শুনেছি গোরখপুর চলে গেছে ।”

“গোরখপুর ? সেট! কোথায় ?”

“আমিও জানি না। বেনারস দিয়ে নাকি যেতে হয়। অযোধ্য1---1”

“সেখানে তপনের কে আছে ?”

“জামাইবাবু-টামাইবাবু কেউ আছে ।-*.কলকাতাঁয় ওকে খাকতে দিল না। তুমি জান ন1?”

জগন্ময় আড়চোখে সতীনের দিকে তাকাল একেবারে খাটে! গলায় বলল, “আযারেস্ট হয়েছিল ।”

সতীন যেন অন্ত কাউকে বলছে, রাস্তার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল, “তপনকে যা টরচার করেছিল-_তুমি ভাবতে পারবে না বেক্টামে বরফ দিয়ে চেপে রাখত, জান? ওর পায়ের নোখগুলে। দেখলে তুমি সিটকে উঠবে সাংঘাতিক টরচার 1” সতীনের হঠাৎ খেয়াল হল তার কথা বাবা-দাদার কানে যাচ্ছে না তো? ঘাড় ফিরিয়ে সতীন দেখল। বাবা সেই একই ভাবে কাত হয়ে বসে, দাদা গদিতে পিঠ দিয়ে। ছুজনে কোন কথা বলছিল কিন! বোঝা গেল না। দাদ। শিয়ালদার ভিড় দেখছে বিরক্ত চোখে।

সতীন চাপা গলায় বলল, “অনেক কষ্টে তপনকে ওর বাবা আর

কালের নায়ক

মামা মিলে ছাড়িয়ে আনে কনডিশাঁন ছিল এখানে থাকতে পারবে না। ওকে গৌরথপুরে পাঠিয়ে দিল বাড়ির লোক ।”

ট্যাক্সি একটা জট পেরুল। আর একটা জট হ্যারিসন রোড ক্রুসিং। কার বাবার সাধ্য রাস্তা দিয়ে যায়-_-সারকুলার রোডের সবটাই প্রায় জুড়ে বসেছে তরিতরকারিঅলারা, আবছা অন্ধকারে ছেঁড়া কলাপাতা উড়ছে রাস্তায়, ডাবের খোলা গড়াগড়ি দিচ্ছে, পচ! কুমড়ো আর বেগুন থে তলে গাড়ি চলে গেছে, মলমৃত্রেরও অভাব নেই ; সমস্ত বাতাস ছুূর্গন্ধে ভারী হয়ে আছে। ওরই মধ্যে একট! রিকশায় বেশ রঙচঙা শাড়ি পরে, গিলটির গয়না-পরা এক বস্তিবাড়ির বউ তার স্বামীর সঙ্গে হেলতে হেলতে ছুলতে ছুলতে হাস্তমুখে চলেছে দেখলেই বোঝা যায় বিয়ে বেশীদিনের নয় বোধ হয় কালীঘাট-ম্যারেজ ! কথাট। ভাবতেই সতীনের কেমন হাসি পেয়ে গেল।

জগন্ময় বলল, “আমাদের অমিতাভ বিজনেস করছে, শুনেছ 1”

“অমিতাভ মৈত্র, না সেনগুপ্ত ?”

“সেনগুপ্ত হবে-সেই কালো! বেঁটে ছেলেটা, টাটগেয়ে-*৭”

“ও তো খুব চালু ছিল।”

“ভাল বিজনেন লাগিয়েছে, হাওয়াই চটি সাপ্লাই দিচ্ছে কেরালায়।”

“হাওয়াই চটি ?” সতীন মেরে গেল যেন।

ট্যাক্সি হযারিসন রোডের মোড় ছাড়িয়ে যেন স্বস্তি পেল। ভিড় হালকা হচ্ছে। একটা দৌতল! বাসকে কাটিয়ে বেরিয়ে এল ট্যাকিটা

বিনয়ভূষণ ছেলেকে জিজ্ঞেস করলেন, “গলার রোগটা কি তোমায় কিছু বলল ?”

. র্থীন বাবার দিকে তাকাল «না, রোগ কি তা বলল না; উইগ পাইপের ইন্ফ্লামেশান হতে-টতে পারে." তোমারটা! ক্রনিক হয়ে গেছে আর কি! একসময়ে ব্রংকাইটিসে খুব ভুগেছ 7”

বিনয়ভূষণ একটু চুপ করে থেকে বললেন, “হোমিওপ্যাথিতে তো

২২ কালের নায়ক

কোন রোগ বলে কিছু নেই-__কি বল! লক্ষণই আসল 1”

“হ্যা; সেই রকম শুনি ।” রথীন কথাবার্তা এড়াবার চেষ্টা করল।

“তোমার এই ডাক্তার জজের মতন জেরা করে। ভাল হোমিও- প্যাথ মাত্রই তাই। আমার মামাশ্বশুর প্রতাপ মজুমদারের কন্টেম- পোরারী, তাকেও দেখতাম.” বলতে বলতে গলা একেবারে বসে গেল বিনয়ভূষণের ; একটা কাশির দমক যেন গলার কাছে এসে আটকে গেল।

র্থীন বলল, “কথাবার্তা আর বলো না বেশী। স্টরেন্‌ হবে ।”

শীত যে আসছে বোঝা যায়। ধোঁয়ায় ধূসর হয়ে গেছে চারপাশ এদিকে আলো কিছুটা কম; ডানহাতি ট্রাম ডিপো, বস্তির পর বস্তি, ধুলোয় ধোঁয়ায় বাতাস ভরা, ডিজেলের গন্ধ এসে গলায় ঢুকে গেল সতীনের, সরকারী বাস রাজাবাজারের মুখে ছাড়িয়ে অনর্গল ধোয়া ছাড়ছে।

“তুমি সত্যিই কিছু করছ না?” সতীন জিজ্ঞেস করল জগন্ময়কে

জগন্ময় বলল, “সেরকম কিছু নয়”

“কোন রকম কিছু করছ! তাই শুনি? সতীন একটু হাসল।

জগন্ময় কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল, “আমি বেহালার রুটে কিছুদিন বাস-কণ্াক্টারি করেছিলাম তারপর ওটা ঠিক আমাদের ধাতে পোষাল না বুঝলে আমার একটু-আধটু গাঁড়ি চালাবার এক্সপিরিয়েন্স ছিল, পাড়ার একটা ছেলে আমায় শিখিয়েছিল। একটা ভাঙা গাড়ি পেয়ে হাত ঝাঁলিয়ে নিলাম তারপর এই বাদলদা-_ আমার গুরু_” বলে জগন্ময় পাশের ড্রাইভার লোকটিকে দেখাল, “গুরুর চেলাগিরি করে আর প্ণশ টাকা বেলতলায় ঘুষ দিয়ে একটা! লাইসেন্স পেয়ে গেলাম মাঝে মাঝে ট্যাক্সি চালাই ।”

ট্যার্সি রাজাবাজারের মোড দিয়ে ডান দিকে ঘুরল। আমহার্ট্ঁ সীট ধরবে।

সতীন রীতিমত বিহ্বল হয়ে গেল। . জগন্ময় বাসের কণ্ডাক্রারি

কালের নায়ক ২৩

করেছে, ট্যাক্সি চালায়। অথচ কলেজে এই জগন্সয় সাংঘাতিক ডখটে থাকত, মানে জগন্ময় কিছু চেলাটেল। জুটিয়ে মাতব্বরি করতে শুরু করে দিয়েছিল। প্রথমে হুল্লোডবাজ ছিল ; পরে ইউনিয়নে ঢুকে পড়ে তখন ছুটো। ইউনিয়ানের মধ্যে রোজই মারপিট চলছে লোহার ডাণ্ড আর বোমা দিয়ে দখলের মহড়া হচ্ছে জগন্সয় নতুন ইউনিয়নে ঢুকে পড়ে একেবারে সরাসরি ডাণ্ডাবাজিতে নেমে গেল।

জগন্ময়কে একবার ঘিরে ফেলে ছোরা মারার চেষ্টা করেছিল অন্য পক্ষ। পারে নি_কেমন করে যেন বেঁচে গিয়েছিল ও। পাল্টা মারপিটে জগন্ময়ের শত্রপক্ষের একজন ঘাড়ে ছুরি খেয়েছিল, কলেজের বাইরে রাস্তায়

সেই জগন্ময় এখন নাকি ট্যাক্সি চালায়!

বিশ্বাস হচ্ছিল না সতীনের। বেটা ব্রাফ দিচ্ছে নাতো? যে লাইন ধরেছিল জগন্ময় সেই লাইনে ওর কিছু একটা হওয়া উচিত ছিল, অন্তত পাড়ার অমুক বলকটকের সেক্রেটারী, তাতে ভাল ভাতা পাওয়া যেত। জগন্ময় তো নিদেনপক্ষে ছোটখাটো একটা লহিসেন্সও বের করে নিতে পারত

সতীনের হঠাৎ কেমন সন্দেহ হল। জগন্ময় কি তাকে বাজিয়ে দেখার চেষ্টা করছে! আজকাল, সতীন শুনেছে, অনেক ছেলে পুলিসের ইন্ফরমারের কাজ করে। মানে, তারা সরাসরি কোন ব্যাপারের সঙ্গে জড়িত নয়, কিন্তু পুলিসের লোক এদের টোপ করে নানা জায়গায় ফেলে রাখে

এ-রকম একটা চিন্তা-ভাবনার পরই সতীন দেখল তাদের ট্যান্সির ঠিক পাশে থানার জিপ। থানার জিপ দেখেই এ-ধরনের একটা চিন্তা এল কি ন! সে বুঝল না না বুঝে নিজের ওপরেই কেমন বিরক্ত হল।

ট্যাক্সি এসে আমহাস্ট্ গ্ীট ধরতেই সতীন হাত বাড়িয়ে বলল, “ডান দিক দিয়ে এগিয়ে-_প্রথম বাঁ হাতি গলি 1”

বাড়ির সামনে এসে ট্যাক্সি দাড়াল।

কালের নায়ক

সতীন দরজা খুলে নেমে "খাচ্ছিল, জগন্ময় বলল, “তুমি ওঁদের বাড়িতে দিয়ে এস। আমি আছি ।”

বিনয়ভূষণকে নামিয়ে আনল র্থীন। এতক্ষণ পরে নিজের বাড়ির দরজায় পা দিতে পেরে তিনি যেন শক্তি পেয়ে গিয়েছেন নিজেই সদরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, সতীন তার পাশে গিয়ে দাড়াল রথীন ট্যাক্সিভাড়৷ মেটাতে লাগল মিটারের দিকে চোখ রেখে।

দোতলার সি'ড়ির মুখেই বাবাকে ছেড়ে দিল সতীন। বউদি আর কাজল বাবার কাছে মেজদাও বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। সতীনের আর কোন দরকার নেই

নীচে নেমে আসতেই সদরের কাছে বড়দার সঙ্গে দেখ!

রথীন ব্যস্ত হয়ে সি'ড়ির দিকে আসছিল ছোট ভাইকে দেখে দাড়িয়ে পড়ে জিজ্ঞেন করল, “ড্রাইভারের পাশে বসে ওই ছেলেটা কে রে? তুই চিনিস ?

সতীন ঘাড় নাড়ল।

“তোর সঙ্গে খুব বকবক করছিল গাড়িতে,” রথীন বলল, “এ পাড়ার ছেলে ??

“না|?

রথীন আর কিছু বলল না।

বাইরে এসে সতীন ট্যাক্সি দেখতে পেল না। না পেয়ে অবাক হয়ে চারপাশ তাকাল জগন্ময় হাওয়া হয়ে গেল নাকি ! কেনই বা সে সতীনকে আসতে বলল, কেনই বা পালাল সতীন বুঝতে পারল না

গলির মুখ দিয়ে এগিয়ে বড় রাস্তায় আসতেই সতীন দেখল, জগন্ময় উল্টে! দিকের ফুটপাথে সিগারেটের দোকান থেকে সিগারেট কিনে ধরাচ্ছে, ট্যাক্সি নেই |

রাস্তা পেরিয়ে এসে সতীন বলল, “আমি ভাবলাম তুমি কেটে পড়েছ।” -

“না; বাদলদ! গাড়ি ঘুরিয়ে রাস্তায় পড়তেই প্যাসেঞ্জার পেয়ে গেল ।”

কালের নায়ক ২৫

“তুমি থেকে গেলে ?”

“বাঠ তোমায় আসতে বললাম--1”

“ফিরবে কি করে ?”

জগন্ময় হেসে ফেলল পট্রামে-বাসে ফিরব। তুমি যে কি বল!”

একটা সিগারেট এগিয়ে দিল জগন্ময় সতীনের দিকে, বলল, “চলো', চাখাই। বহুত দ্রিন পরে দেখা গল্পটল্প করি একটু”

সতীন সিগারেট নিয়ে ধরাল।

“তুমি কোথায় থাক ? সতীন জিজ্ঞেস করল

“আগে ক্রীক রোঁয়ে থাকতাম এখন তালতলায় ।”

সতীনের কী যেন একটা কথা হঠাৎ মনে এসেও আসতে চাইছিল না। জগন্ময়ের দিকে তাকিয়ে আবার মুখ নামিয়ে নিল। মনে এল না। মুখ উঠিয়ে রাস্তার দিকে তাকাল। ছুটো বাস আসছে পেছনে পেছনে, একটা যেন আর একটাকে তাড়া মারতে মারতে আসছে। বিশ্রী হর্ণের আওয়াজ ধুলোর ঝাপটায় রাস্তার আলো যেন ঢেকে এল

শরৎ কাঁফেতে সতীন থাকে না। সেখানে এখন পাড়ার ছেলের! বসে আছে, বন্ধুবান্ধব রয়েছে, হয়ত কপিলও বসে আছে তার অপেক্ষায়। জগন্ময়কে ওই আড্ডায় নিয়ে যেতে চায় না সতীন। তার চেয়ে কেশব সেন স্ত্রীটের দিকে চায়ের দোকানে বসবে

সতীন হঠাৎ বলল, “আচ্ছা, তোমার বাবা না কোথাকার মুন্সেফ- টুন্সেফ ছিলেন ?”

জগন্ময় সিগারেট টানল। কিছু বলল না। সতীন তাকিয়ে থাকল

শেষে জগন্ময় বলল, “আমার বাবা নয়। আমি বাবা বলতুম। সিউড়ির দিকে দিনছুপুরে খুন হয়ে গেছে.

সতীন থমকে গিয়ে দাড়িয়ে পড়ঙ্গ।

তিন

বিছানায় শুয়ে শুয়ে সতীন সিগারেটটা শেষ করে ফেলল। বাড়ির লোকের খাওয়াদাওয়া শেষ হয়ে যাবার পর যেমন সংসারের লোকজনের সাড়াশব্দ কমে যায় সেই রকম চুপচাপ হয়ে এসেছে; বউদির গলা, লক্ষ্মীর কাজ গুটে1নোর অল্পন্বল্প শব্খ ছাড়া এখন নীচের তলা শাস্ত। মেজদার ঘরে রেডিও বাজছে, খুবই মৃছু স্বরে, প্রায় শোনা যায় না, কখনও কখনও অস্পষ্ট করে গানের দু-একটা কলি যা ভেসে আসছে তাতে মনে হয় কোন রবীন্দ্র-সঙ্গীত হচ্ছে মেজদা! গান-বাজনার তেমন কিছু ভক্ত নয়, তবে রাত্রের দিকে তার রেডিও খোলার বাতিক আছে মাঝে মাঝে ইংরিজী বাজনা শোনে রাত এখন ঠিক কত বল৷ মুশকিল; দ-টা বেজে গেছে বোধ হয়; তাদের বাড়ির গলি দিয়ে এক-আধটা রিকশা দু-একজন মানুষ যাচ্ছে এখনও গা-সিরসির-করা শীতও পড়ে গিয়েছে কলকাতায় ; শীতের দিন এসে গেল বলেই রাত যেন তাড়াতাড়ি নিঝুম হয়ে আসে, রাস্তাঘাট গলিটলি ফাঁকা ফাক! হয়ে যায়।

আধ-ভেজানো দরজা ঠেলে কাজল ঘরে এল সতীন বোনের দিকে তাকাল

নীচের তলার এই ঘরটা তারা ভাইবোনে ভাগ করে নিয়েছে বরং বল। যায়, তাঁদের ছুজনের ভাগে পড়েছে আসলে এই বাড়ি সতীনদের কথা ভেবে তৈরী হয় নি। ঠাকুরদা হাজার বিশেক টাকায় কিনেছিল, সেকালের বিশ হাজার, মানে খুব একট কম নয় বলেই সতীন শুনেছে। দোৌতল! বাড়ি। ঠাকুরদ। নিজে কিছু অদলবদল করেছিল বাড়িটার। বাবার আমলে বার দুই-তিন ঘরদোর সারাসারি ছাড়া দোতলার এক কোণে ছোট একট! ঠাকুরঘর, ছাদে চিলেকোঠার পাশে জঞ্জাল জমানোর চিলতে মতন টিনের শেড আর নীচের এবং ওপর্তলার কলঘরের কিছু কিছু সংস্কার সাধন ছাড়। বিশেষ কিছু হয় নি। দোতলায় হিসেব মতন তিনটে ঘর ; আসলে আড়াই। নীচে রান্নাবান্নার ঘর বাদ দিয়ে ছুটো

কালের নায়ক ২৭.

মা বেঁচে থাকার সময় ওপরের তলায় বাবা-মা'র সঙ্গে সতীনরা থাকত। বড়দার বিয়ের পর বড়দ1 ওপরতলায় ঘর পেল, সতীন নীচে নেমে এল। কাজল তখনও মা'র কাছে মা মারা যাবার পর বাবা ওপরেই থেকে গেল, বড়দা নিজের ঘর ছাড়াও বাড়তি আধখানা ঘর দখল করল, কেননা বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে জিনিসপত্র সমেত একটা ঘরে বড়দার কুলোচ্ছিল না। কাজল নীচে সতীনের ঘরে এসে ঢুকল। অবশ্য মেজদা যখন কলকাতার বাইরে চাকরি করছিল তখন কাজল মেজদার ঘরটায় থাকত। এখন সতীনের ঘরে থাকে | বাবার শরীরটরীর বেশী খারাপ থাকলে কাজলকে বাবার কাছেই থাকতে হয়। নয়ত নয়। এটা ঠিক, বড়দ1 বাবার ব্যাপারে কাঁজলের ওপর তেমন ভরসা করে ন। _-কাজেই কাজলের বাবার কাছে থাকার ব্যাপারেও তেমন জোর দেয় না। তা ছাড়া কাজল ছোট বলে বড়দা, দিদি কেউই বাবার কাছে কাজলকে সারাক্ষণ থাকতে দিতে চায় না। অনেক সময় এতে নাকি ছোটদের__মানে বাড়ির ছোট সন্তানদের মনে একটা চাপা রোগটোগ দেখা দেয়। সতীন নিজে এত বোঝে না; মোটামুটি বোঝে যে, বাবার রোগ নিত্যদিনের ভোগ বা যন্ত্রণা, মনের নানা আফসোস কাজলকে বাবা শোনায় এটা বোধ হয় দাদারা পছন্দ করে না

এই ঘরটা মন্দ নয়। যদিও গলির গায়ে তবু জানলা খুললে গলি চোখে পড়ে না। ঘরট! পুব-দক্ষিণ ঘে'ষে, গলিটা উত্তর দিকে মেজদার ঘরের জানল। গলির গায়ে। সতীনদের এই ঘর সামান্য বড়, পুবে হাত- কয়েক ফাক। জায়গা আছে, দক্ষিণে শীলবাবুদের বড় বাড়ির গা-লাগানে। গ্যারেজের শেড, চাকরবাকরদের আস্তানা, দক্ষিণটা তেমন ভাবে আটকে যায় নি ; ফলে ঘরগুলো৷ তেমন দমচাপা লাগে না। মেজদার ঘরটাও গলির গায়ে গায়ে হয়েও খুব খারাপ নয়। আসলে পুরনো বাড়ির পক্ষে তাদের এই বাড়ি এখনও বেশ দাড়িয়ে আছে, গলির ভেতরের দিকে বলেই হইহট্টগোল, গরড়িঘোড়ার ঝঞ্ধাট থেকে খানিকটা মুক্ত। বাবা চিরকাঁলই বলে এসেছে, ঠাকুরদা এসব ব্যাপারে খুব বিচক্ষণ ছিল, সাত-পাঁচ ভেবে, সুখ-স্থবিধে খতিয়ে দেখে, বাড়ির ভিত

২৮ কালের নায়ক

দেওয়াল কড়িবরগ! সব খু'টিয়ে খুঁটিয়ে নজর করে তবে এই বাড়ি কিনেছিল। নয়ত আজও বাড়িট! এভাবে দাড়িয়ে থাকার কথা নয়।

সতীন বোনের দ্িকে তাকাল দরজা বন্ধ করেছে কাজল বন্ধ করে ঘরের একপাশে সরে গিয়ে যুখ হাত মুছে নিচ্ছে

কাজল শোবার আগে কিছু মেয়েলী প্রসাধন সেরে নেয়। যেমন, শীত পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সে মুখ এবং হাতের খসখসে ভাবটা! মোলায়েম করার জন্তে একট। সস্তা ক্রীম মাখে। ক্রীমে কোন্‌ পদার্থ আছে কে জানে, সামান্য মাখার পর কাজলের মুখ একেবারে তেলতেলে হয়ে যাঁয়। সতীনের তখন বোনের মুখ দেখতে ভাল লাগে না; গা ঘিনঘিন করে। আজকাল বাজারে কত ভাল ভাল ক্রাম বেরিয়েছে কিন্তু কাজলের সেই আছ্ভিকালের ক্রীম | ওটা মা'র কাছ থেকে শিখেছে কাজল-_ম! ওকে মাখিয়ে দিত

আজ অবশ্ঠ সতীন বোনের মুখ নিয়ে মাথা ঘামাল না। বলল, “আজ একটা ব্যাপার হয়ে গেল, বুঝলি ! দারুণ ব্যাপার”

কাজল দীড়িয়ে াড়িয়ে মুখে হাতে ক্রীম ঘষছিল, দাদার দিকে তাকাল।

সতীন বলল, “আমার এক পুরনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল আজ। কলেজের বন্ধু জগন্ময়।”

কাজল কিছু বলল না। দাদার অজস্র বন্ধু; পাড়ার, বেপাড়ার। অনেককে কাজল ভাল করেই চেনে, কেউ কেউ মুখ-চেনা, আবার অনেকের